সোহেল আহমেদ ;
নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের যে ছোট কক্ষটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল তাঁর রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, সেখানেই এবার সর্বোচ্চ সাংগঠনিক দায়িত্বে বসলেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিরোধী রাজনীতির চরম প্রতিকূল সময়ে যিনি টানা ৭৮৭ দিন ঘর-সংসার ছেড়ে দলীয় কার্যালয়কেই নিজের ঠিকানা বানিয়েছিলেন, তিনি এখন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা ১১টার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে নিজের নতুন দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন রিজভী। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে দপ্তর সামলানো এই নেতার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এ ভূমিকা বিএনপির রাজনীতিতে এক বড় ধরনের প্রতীকী পরিবর্তনের সূচনা করল।
ছাত্ররাজনীতি ও রক্তঝরা রাজপথ:
রুহুল কবির রিজভীর রাজনীতির সূচনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে। সেখানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৯ সালের রাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রাজপথে মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর স্বেচ্ছাসেবক দলের দায়িত্ব সামলে প্রবেশ করেন বিএনপির মূল রাজনীতিতে।
দপ্তরকেন্দ্রিক আন্দোলন ও নয়াপল্টনের স্মৃতি:
বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে নয়াপল্টনের কার্যালয় হয়ে উঠেছিল রিজভীর রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল ঘাটি। দমনপীড়ন ও পুলিশি নজরদারির মধ্যেও দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সংবাদ সম্মেলন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত প্রচার করে গেছেন। ২০১৬ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখপাত্র।
২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে একটানা অবস্থান ও রাত্রিযাপন শুরু করেন রিজভী। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ও চরম রাজনৈতিক সংকটের মুখে টানা ৭৮৭ দিন তিনি সেখানে অবস্থান করে ইতিহাস গড়েছিলেন। ২০১৩ এবং ২০২২ সালের পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তারের মতো কঠিন ঘটনার মুখোমুখি হয়েও নয়াপল্টনের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছেদ হয়নি।
দ্রুত পদোন্নতি ও শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন:
সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিএনপি সরকার গঠনের পর রিজভীর রাজনৈতিক পদে দ্রুততম সময়ে বড় পরিবর্তন আসে। প্রথমে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। এরপর ১৫ আগস্ট তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য করা হয়। এর ঠিক পাঁচ দিন পর ২০ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব পদ শূন্য হয়। দলের গঠনতন্ত্রের ৭ (খ-৬) ধারা অনুযায়ী সেদিনই রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়।
নতুন ভূমিকা ও আগামীর সাংগঠনিক পরীক্ষা:
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রিজভী গভীর দায়িত্ববোধ ও বিনয় প্রকাশ করেছেন। এতদিন বিরোধী দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজপথে সরব থাকলেও, এখন ক্ষমতায় থাকা বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ধরে রাখাই তাঁর প্রধান কাজ। সরকার পরিচালনার সাথে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের দূরত্ব কমানো, তৃণমূলের শৃঙ্খলারক্ষা এবং দলের সার্বিক সাংগঠনিক গতিশীলতা বজায় রাখাই হবে বিএনপির এই নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মূল পরীক্ষা।