আব্দুল মালেক মনি :
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ঢাকা জিপিওতে (জেনারেল পোস্ট অফিস) লেটার রাইডারের সিল ছাড়াই কথিত ‘সিডিএস’ (কাস্টমস ডিক্লারেশন) তৈরি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদেশে প্যাকেট বুকিংয়ের অভিযোগের মূল রূপকার হিসেবে নাম উঠে এসেছে ওলিউল্লাহ ওরফে ওলির। প্রশাসন শাখার এই কর্মচারীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চক্রটি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে ডাক বিভাগের আন্তর্জাতিক ডাক সেবার নিরাপত্তা বলয় ভেঙে চলেছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় পুরো পোস্টাল সেক্টর।
ওলিউল্লাহর কক্ষে 'বিকল্প কাউন্টার': নিয়মের তোয়াক্কা না করার চিত্র
আন্তর্জাতিক ডাক আইন ও ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (UPU)-এর নিয়ম অনুযায়ী, দেশের বাইরে পাঠানো প্রতিটি পার্সেল বা প্যাকেট কঠোর কাস্টমস তল্লাশি ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু জিপিওর প্রশাসন শাখায় ওলিউল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন কক্ষটিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তল্লাশি ও সিল এড়ানোর কৌশল: ডাক বিভাগের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো পার্সেল বুকিংয়ের আগে লেটার রাইডার (তল্লাশীকারক) কর্তৃক তা ভৌত পরীক্ষা করা এবং তাতে নির্ধারিত সিল-স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ উঠেছে, ওলিউল্লাহ তার কক্ষে বসেই সিলবিহীন পার্সেল গ্রহণ করছেন এবং নিজেই ‘সিডিএস’ বা ডিক্লারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
প্রশাসনের প্রভাব ও গোপন কার্যক্রম: সাধারণ গ্রাহকদের নির্ধারিত কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ও কাস্টমস যাচাইয়ের পর বুকিং দিতে হলেও, ওলিউল্লাহর সুপারিশ ও সরাসরি হস্তক্ষেপে নির্দিষ্ট কিছু মালপত্র কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই আন্তর্জাতিক বুকিং তালিকায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ও রাজস্ব ফাঁকির শঙ্কা
ওলিউল্লাহর নির্দেশ ও প্রত্যক্ষ মদদে পার্সেল বুকিং হওয়ার এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে এক বিশাল ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অবৈধ পণ্য পাচারের পথ সুগম:
লেটার রাইডারের সিল এবং কাস্টমস স্ক্রিনিং পাশ কাটিয়ে মালপত্র বুকিং করার অর্থ হলো—মাদক, বেআইনি কাগজপত্র বা যেকোনো অবৈধ বস্তু বিদেশে পাচার হওয়ার পথ খুলে দেওয়া।
রাজস্ব ক্ষতি ও দেশের ভাবমূর্তি:
নির্দিষ্ট ওজন ও মান অনুযায়ী ফি না নিয়ে কম রাজস্বে পার্সেল ছাড়ার অভিযোগও তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, আন্তর্জাতিক ডাক নেটওয়ার্কে যদি বাংলাদেশ থেকে অবৈধ কোনো পার্সেল ধরা পড়ে, তবে তার পুরো দায় ডাক বিভাগ এবং দেশের ওপর এসে পড়বে।
ওলিউল্লাহর জালিয়াতি প্রমাণের সুনির্দিষ্ট মাধ্যম
অভিযোগের তীব্রতার ভিত্তিতে তদন্তকারী দলের উচিত ওলিউল্লাহর অপকর্মের ডিজিটাল ও ভৌত প্রমাণগুলো দ্রুত
সীলগালা ও পরীক্ষা করা:
ওলিউল্লাহর ইউজার আইডি ও আইপি লগ: ডাক বিভাগের IPS (International Postal System) সফটওয়্যারে ওলিউল্লাহর ইউজার আইডি ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে কোন কোন আইটেমের ‘সিডিএস’ সম্পন্ন হয়েছে এবং কোন কোন বারকোড জেনারেট করা হয়েছে, তার পুরো লগ বের করা।
সিসিটিভি ফুটেজ ও ট্র্যাকিং বিশ্লেষণ:
প্রশাসন শাখার ওই কক্ষটির সামনের গত কয়েক সপ্তাহের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলেই বেরিয়ে আসবে কার নির্দেশে এবং কারা বস্তাভর্তি পার্সেল নিয়ে ওই কক্ষে যাতায়াত করেছে।
বুকিং ও ফিজিক্যাল রসিদ মেলানো: ওলিউল্লাহর আইডি থেকে ইস্যুকৃত রসিদ, সংশ্লিষ্ট পার্সেলের বারকোড এবং গন্তব্যের তথ্য মিলিয়ে দেখলে জানা যাবে কোনো ভুয়া ঠিকানা বা তথ্যে এই বুকিংগুলো করা হয়েছে কি না।
কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষা
ডাক বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে ওলিউল্লাহসহ এই চক্রের পেছনে থাকা অন্য মদদদাতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ওলিউল্লাহর এই বেআইনি সিন্ডিকেটের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা অনুসন্ধানে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ কর্মী ও আন্তর্জাতিক সেবা ব্যবহারকারী গ্রাহকরা।
এই সংবাদের পরবর্তী পর্ব ও তদন্তের হালনাগাদ জানতে সাথেই থাকুন।