ঝুমুর আক্তার
শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি:
চারপাশের ঘরগুলো বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। অথচ একটি ঘরে জ্বলছে ছোট্ট একটি মোমবাতি। সেই ক্ষীণ আলোয় বইয়ের পাতায় চোখ রেখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী উম্মে হানি। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চর শেখপুর বাঁশকান্দি গ্রামের হাবিবুর রহমানের পরিবার চার বছর ধরে বিদ্যুৎহীন।
পরিবারটির বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে রয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি। আশপাশের প্রায় সব বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তাদের ঘরে এখনো পৌঁছেনি বিদ্যুতের আলো। পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশীর বাধার কারণে সংযোগ নিতে পারছেন না তারা।
সামনে উম্মে হানির এইচএসসি পরীক্ষা। ভালো ফল করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে প্রতিদিনই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অন্ধকার ও অসহনীয় গরম। রাতে পড়তে বসলে মোমবাতির আলোই তাঁর একমাত্র ভরসা। কখনো কখনো মুঠোফোনের টর্চ জ্বালিয়েও পড়াশোনা করতে হয় তাঁকে।
উম্মে হানি বলেন, “সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা। রাতে পড়তে বসলে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কষ্ট হয়। মোমবাতির আলোয় পড়তে হয়। গরমের মধ্যেও পড়াশোনা করতে হয়। আমার খুব কষ্ট হয়। আমি চাই, আমাদের বাড়িতে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হোক।”
উম্মে হানির এক সহপাঠী বলেন, “আমাদের অল্প সময় বিদ্যুৎ না থাকলেও পড়াশোনা করতে অনেক সমস্যা হয়। অথচ উম্মে হানি চার বছর ধরে বিদ্যুৎ ছাড়া পড়াশোনা করছে। সামনে তার পরীক্ষা। আমরা চাই, দ্রুত তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হোক।”
এলাকাবাসী জানান, মোমবাতির আলোয় গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করা অত্যন্ত কষ্টকর। তাদের দাবি, বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত পরিবারটির ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হোক।
অভাবের সংসারে উম্মে হানির পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাও সহজ নয়। তাঁর মা সেলিনা বেগম একটি মাদ্রাসায় রান্নার কাজ করেন। সংসারের পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকেও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
নিজের পড়াশোনার খরচের কিছুটা জোগাতে কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেন উম্মে হানি। দিনে অন্যের সন্তানদের পড়ান, আর রাতে মোমবাতির আলোয় নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য বই নিয়ে বসেন।
পরিবারটির অভিযোগ, দীর্ঘ চার বছর ধরে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। বাড়ির মাত্র ৩০ ফুট দূরে বিদ্যুতের খুঁটি থাকলেও প্রতিবেশীর বাধার কারণে সংযোগ নিতে পারছেন না বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে শিবচর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় বলেন, “বাধাটা যদি তারা নিরসন করে দেয়, আমরা আজকেই লাইন লাগিয়ে দেব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আছেন, তাঁদের মাধ্যমে বাধাটা অপসারণ করে দিন। আপনার বাড়িতে সংযোগ দিতে গিয়ে আমাকে যদি কেউ মারতে আসে, সেটা আপনারা নিরসন করে দেবেন। আমি কানেকশন করে দেব।
তবে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিবেশী বাবুল বেপারীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে বিদ্যুতের খুঁটি। অথচ চার বছরেও সেই খুঁটি থেকে আলো পৌঁছেনি হাবিবুর রহমানের ঘরে। অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করেই এগিয়ে চলেছেন উম্মে হানি।
অন্য শিক্ষার্থীরা যখন বিদ্যুতের আলোয় এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর ভরসা একটি ছোট্ট মোমবাতি। মোমবাতির আলো ক্ষীণ হলেও উম্মে হানির স্বপ্ন বড়।
পরিবারটির প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তাদের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেবে। চার বছরের অন্ধকার পেরিয়ে এবার যেন উম্মে হানির পড়ার ঘরে জ্বলে ওঠে বিদ্যুতের আলো আর সেই আলোয় এগিয়ে যায় তাঁর স্বপ্ন।