ঝুমুর আক্তার
শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বহুল পরিচিত ‘বরহামগঞ্জ পোস্ট অফিস’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘শিবচর উপজেলা পোস্ট অফিস’ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘বরহামগঞ্জ’ নামটির সঙ্গে এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে উল্লেখ করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ডাক বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর পোস্টাল বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের কার্যালয় থেকে গত ২৪ আগস্ট জারি করা এক চিঠিতে ‘বরহামগঞ্জ’ (BARHAMGANJ) উপজেলা পোস্ট অফিসের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবচর উপজেলা পোস্ট অফিস’ (SHIBCHAR UPAZILA POST OFFICE) করার বিষয়টি জানানো হয়। প্রশাসনিক উপজেলার নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ‘বরহামগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি-বেসরকারি চিঠিপত্র, বিভিন্ন নথি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে হঠাৎ করে নাম পরিবর্তন করা হলে পুরোনো তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে নতুন নামের সমন্বয় করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবচরের এক সরকারি চাকরিজীবী বলেন, “ডাকঘরের নাম পরিবর্তন হলে বিভিন্ন নথিপত্র ও কাগজপত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গায় পুরোনো নামের তথ্য রয়েছে। সেগুলো পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হবে। আমার দৃষ্টিতে এ পরিবর্তনের তেমন প্রয়োজন ছিল না।”
আরেক সরকারি কর্মচারী বলেন, “আমি আর এক বছর পর অবসরে যাব। আমার এনআইডি, বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্রসহ অনেক জায়গায় বরহামগঞ্জ নামটি উল্লেখ রয়েছে। নাম পরিবর্তনের কারণে পেনশন বা জিপি ফান্ডের টাকা উত্তোলনে কোনো জটিলতা হবে কি না, সেটিও এখন পরিষ্কার নয়। জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিতে সংশোধনের প্রয়োজন হলে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। ব্যাংক ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্যও পরিবর্তন করতে হতে পারে। বিষয়টি তাই অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন, “এটি এলাকার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একটি পরিচিত নাম। এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। ‘বরহামগঞ্জ’ নামটি শিবচরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে পুরোনো নামটি বহাল রাখা হোক।”
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক উপজেলার নাম ‘শিবচর’ হওয়ায় ডাকঘরের নামও পরিবর্তন করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। তাঁদের ভাষ্য, একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নামের সঙ্গে যখন স্থানীয় মানুষের পরিচিতি ও ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততা রয়েছে, তখন তা পরিবর্তনের আগে জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা পোস্টমাস্টার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “আমি প্রায় তিন মাস হলো শিবচর পোস্ট অফিসে যোগদান করেছি। এর আগে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আমাদের অফিসিয়ালভাবে কিছু জানানো হয়নি। গত ২৪ আগস্ট ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের কার্যালয় থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। সেখানে পোস্ট অফিসের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে কী কারণে নামটি পরিবর্তন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা এখনো বিস্তারিত কিছু জানি না।”
এদিকে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে স্থানীয়দের অনেকে ‘বরহামগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। কেউ কেউ নামটিকে শিবচরের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘বরহামগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করে জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে স্থানীয় ঐতিহ্য ও জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মতামত নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।