শাহীন আলম আশিক :
সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আমাদের সমাজে যে সামাজিক ধস নেমেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার আজ প্রবাসীরা। বিদেশে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে অর্থ তারা দেশে পাঠাচ্ছেন, তার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে পরকীয়া আসক্ত স্ত্রী বা স্বজনদের খেয়ালিপনায়। ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার পর সম্পর্ক অস্বীকার করার মতো ঘটনা এখন নিত্যদিনের সংবাদ। শুধু গৃহবধূরাই নন, এই সর্বনাশা ফাঁদে জড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে স্কুল-কলেজের উঠতি বয়সের তরুণী শিক্ষার্থীদের জীবনও।
প্রবাসীদের নিঃস্ব হওয়ার নির্মম চিত্র:
পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে কিংবা ভবিষ্যতের সোনালী স্বপ্নের আশায় প্রবাসে পাড়ি জমান লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রবাসীর পাঠানো কষ্টের উপার্জিত অর্থ ও স্বর্ণালংকার ব্যবহার করে স্ত্রীরা জড়িয়ে পড়ছেন ফেসবুকভিত্তিক পরকীয়া সম্পর্কে। প্রাথমিক আলাপ থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক একসময় এমন পর্যায়ে যায় যে, তারা ঘর ছাড়তে দ্বিধাবোধ করছেন না। যাওয়ার সময় স্বামীর পাঠানো জমানো নগদ টাকা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট এবং মূল্যবান স্বর্ণালংকার লুটে নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়লে তারা সম্পর্ক সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন।
প্রলয়ঙ্করী পরিণতি:থানা-পুলিশ, মামলা ও আত্মহত্যার মিছিল:
এই ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের শেষ পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রবাসীরা যখন সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফেরেন কিংবা প্রবাস থেকেই আইনি লড়াইয়ে নামেন, তখন শুরু হয় থানা-পুলিশ ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা-মোকদ্দমা। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী ও তার পরকীয়া প্রেমিক কর্তৃক পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইল বা প্রতারণার শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে অনেক প্রবাসী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম পথ বেছে নিচ্ছেন। সমাজে বাড়ছে আত্মহত্যার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা গোটা দেশকে ভাবিয়ে তুলছে।
স্কুল-কলেজের তরুণীরাও পড়ছে এই ফাঁদে:
গৃহবধূদের পাশাপাশি এই ভার্চুয়াল পরকীয়া ও প্রতারণার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে স্কুল-কলেজের তরুণী শিক্ষার্থীরা। ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া আইডি বা প্রলোভন দেখিয়ে কোমলমতি ছাত্রীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলছে একটি চক্র। আবেগের বশে বা অসচেতনতার কারণে এই ফাঁদে পা দিয়ে মেয়েরা পড়াশোনা হারিয়ে ঘর ছাড়ছে কিংবা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়ছে।
সমাজ ও পরিবারের করণীয়:
এ ধরনের সামাজিক অপরাধ রোধে কেবল আইন দিয়ে সব সমাধান সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক সামাজিক প্রতিরোধ:
প্রবাসীদের সতর্কতা:
আস্থার জায়গায় স্বচ্ছতা রাখা এবং পরিবারের সাথে নিয়মিত ও মানসম্মত যোগাযোগ রাখা।
পারিবারিক নজরদারি:
সন্তানদের বা পরিবারের সদস্যদের অনলাইন কার্যক্রম এবং মেলামেশার প্রতি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ভূমিকা:
এই ধরনের প্রতারক চক্র, ব্ল্যাকমেইলার এবং জালিয়াতির সাথে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই কালো থাবা থেকে সমাজ ও পরিবারকে রক্ষা করতে এখনই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে না এলে এই অপরাধের পরিধি আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।