ডেঙ্গু জ্বর হলো একটি মশাবাহিত ভাইরাল সংক্রমণ, যা মূলত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এর ভয়াবহতা বিরাজ করছে যেটা অনেক আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশে এই বছর (১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত) মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮,৪০০ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭৬ জন। Director General of Health Service এর সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
গত ২৪ ঘন্টায় নতুন আক্রান্ত : ১৪৮৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু হয়েছে : ৫ জন।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন : দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৪,১৩২ জন ডেঙ্গু রোগী বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আসুন, এখন আমরা জেনে নেই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ, মারাত্মক ডেঙ্গুর সতর্কতা, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় করণীয়।
লক্ষণসমূহ :
মশা কামড়ানোর সাধারণত ৪-১০ দিন পরে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় এবং তা ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
১. তীব্র জ্বর : হঠাৎ করে শরীর ১০০-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর হওয়া।
২. তীব্র মাথাব্যথা : মাথার সামনের অংশে বা চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা।
৩. মাংসপেশি এবং জয়েন্টে ব্যথা : শরীর বা হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে একে অনেক সময় “ব্রেক-বোন ফিভার” বা হাড়ভাঙা জ্বরও বলা হয়।
৪. বমি বমি ভাব : খাবারে অরুচি এবং ঘন ঘন বমি হওয়া।
৫. র্যাশ বা চামড়ায় দাগ : জ্বরের কয়েকদিন পর সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেওয়া।
মারাত্মক ডেঙ্গুর সতর্কবার্তা (Warning Signs) :
সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পর বা ৩ থেকে ৭ দিনের মাথায় এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে:
১. তীব্র পেট ব্যথা এবং ক্রমাগত বমি হওয়া।
২৷ মাড়ি, নাক বা ত্বকের নিচে রক্তপাত হওয়া।
৩. শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
৪৷ চরম ক্লান্তি, অস্থিরতা বা বিভ্রান্তি।
৫. রক্তে প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাওয়া।
চিকিৎসা ও করণীয় :
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম : রোগীকে সম্পূর্ণ বেড রেস্টে থাকতে হবে।
২. কোনো উচ্চ মাত্রার ব্যথানাশক জাতীয় ওষুধ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
৩. প্রচুর তরল খাবার : পানিশূন্যতা রোধে প্রচুর পানি, খাবার স্যালাইন (ORS), ডাবের পানি এবং ফলের রস খাওয়াতে হবে।
৪. কোনো অবস্থাতেই সাধারণ জ্বর মনে করে বাসায় বসে থাকবেন না। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক টেস্ট এবং ঔষধ গ্রহণ করবেন।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা :
এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ এবং মশার কামড় থেকে বাঁচাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র উপায়:
মশার কামড় থেকে বাচুন : দিনের বেলা এবং সন্ধ্যায় এডিস মশা বেশি কামড়ায়। তাই ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন, শরীর ঢাকা পোশাক পরুন এবং মসকুইটো রিপেলেন্ট (মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে) ব্যবহার করুন।
পানি জমতে দেবেন না : এডিস মশা ঘরের ভেতরে বা চারপাশে জমে থাকা পরিষ্কার জলে (যেমন: ফুলের টব, টায়ার, বালতি, এসি বা ফ্রিজের ট্রে) ডিম পাড়ে। তাই সপ্তাহে অন্তত একবার জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন।
পরিচ্ছন্নতা : ঘরের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসপূর্ণ রাখুন। জানলা ও দরজায় নেট ব্যবহার করতে পারেন।
ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে আসা : অনেকেই মনে করেন একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে আর হয় না। কিন্তু এটা একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে আবার ও ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে এবং তার পরিনতি ও ভয়াবহ হতে পারে। তাই একবার ডেঙ্গুজ্বর হলে পরবর্তী তে যদি আবার ও জ্বরে আক্রান্ত হন সেটা কোনো ভাবেই অবহেলা করবেন না।
সর্বোপরি, সকলের সুস্থতা কামনা করে আজকে এখানেই শেষ করছি। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।