October 19, 2026, 10:35 pm
শিরোনাম:
অপরাধ দমন বনাম আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলা: ইশরাক বিতর্ক ও রাষ্ট্রের দায়। এপিএসের পর এবার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকেও সরালেন খাদ্যমন্ত্রী সাংবাদিক লুৎফুল জামান হত্যার প্রতিবাদে টেকনাফে সাংবাদিকদের মানববন্ধন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জমি দখলের অভিযোগে এলাকাবাসীর মানববন্ধন সাংবাদিক লুৎফুল জামান হত্যার প্রতিবাদে ভৈরবে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত। সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএমইউজের মানববন্ধন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে বিএমইউজের মানববন্ধন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার প্রতিবাদে ফেনীতে বিএমইউজের মানববন্ধন শিবচরে সড়ক দুর্ঘটনায় বিএনপি নেতা শহীদ চেয়ারম্যানের দাফন সম্পন্ন আজ ১৬ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছে জয় চৌধুরী ও মৌ খান অভিনীত নতুন সিনেমা ‘স্নেহের বন্ধন

অপরাধ দমন বনাম আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলা: ইশরাক বিতর্ক ও রাষ্ট্রের দায়।

Reporter Name

 

​শাহিন আলম আশিক
বিশেষ কলাম ;

​মাদকের ভয়াল থাবায় যখন একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, “আইনের কোনো যান্ত্রিক ব্যাখ্যা, কিংবা প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডের কোনো আমলাতান্ত্রিক যুক্তি দিয়ে কি সেই সন্তানহারা মায়ের কান্না থামানো সম্ভব ?
যাঁর স্বপ্ন চোখের সামনে মাদকের নীল ছোবলে ছাই হয়ে গেছে?” প্রটোকলের কঠোরতার চেয়ে অপরাধ দমনে সরকারের দৃশ্যমান ‘জিরো টলারেন্স’ ও কার্যকর পদক্ষেপই জনগণের প্রধান অগ্রাধিকার। সম্প্রতি রাজধানীর গেন্ডারিয়ার মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সরেজমিনে গিয়ে সরাসরি মাদক আস্তানায় অভিযান চালানো এবং তৎপরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অজুহাতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তাঁর পদত্যাগের নির্দেশ—পুরো দেশকে এক গভীর কাঠামোগত ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনাটি আজ দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে একটি মৌলিক প্রশ্নকে নির্মমভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—অপরাধ দমনে আইনি শৃঙ্খলার বাধ্যবাধকতা এবং সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আকুল আকাঙ্খার মধ্যকার দূরত্ব আসলে কতটা প্রকট?

​১. প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা, জনক্ষোভ ও ইশরাকের পদক্ষেপ

​রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, গেন্ডারিয়ার গুন্টিঘর কিংবা দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোর চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেটগুলোর তৎপরতা কেবল কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি এক সুসংগঠিত এবং অশুভ রাজত্ব। অতীত অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিযানের সিদ্ধান্ত যখন তৈরি হয়, তখনই নেপথ্য যোগাযোগে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। নতুবা অভিযানের মুখে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ককটেল বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে মূল মাদক সম্রাটদের কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

​আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) দীর্ঘদিনের এই দৃশ্যমান অকার্যকারিতা ও কাঠামোগত স্থবিরতার মুখে একজন তরুণ জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রী যখন আর চুপ থাকতে না পেরে স্বশরীরে মাঠে নামেন, তা প্রচলিত আইন বা প্রটোকলের সংজ্ঞায় হয়তো ‘নিয়মবহির্ভূত’ কিংবা ‘প্রশাসনিক এখতিয়ারবহির্ভূত’। কিন্তু মাদকের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাজারো নিঃস্ব পরিবারের চোখে এটি কেবল প্রশাসনিক সীমানা লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আইনি জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে এক অত্যন্ত সাহসী, সময়োপযোগী ও জনবান্ধব সামাজিক প্রতিবাদ। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধীরগতি ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তৈরি হওয়া গভীর জন-জনআস্থা ইশরাক হোসেনের এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপকে জনমনে এত দ্রুত তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

​২. পদত্যাগের সিদ্ধান্ত: প্রশাসনিক বার্তা বনাম মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
​প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’, প্রটোকল এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিধিমালা রক্ষার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার এক অনিবার্য প্রতিক্রিয়া। তবে নীতি-নির্ধারণী এই সিদ্ধান্তের ফলে সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই:

​মাদক সিন্ডিকেটের অশুভ মানসিক জয়: যে রাষ্ট্র ঘোষিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সেই সরকারেরই এক মন্ত্রী মাদকবিরোধী চরম অবস্থান নেওয়ার কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলে নেপথ্যের প্রভাবশালী গডফাদার ও সিন্ডিকেট চক্রগুলো মানসিকভাবে নিজেদের আরও শক্তিশালী ও অনাক্রম্য মনে করার দুঃসাহস পাবে।

​মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে অচলবস্থা: আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে নিজেদের পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে মাদক সম্রাটের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিতে অত্যন্ত ইতস্তত ও আত্মরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করতে পারেন। এতে মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমনের গতি মারাত্মকভাবে শিথিল হয়ে যেতে পারে।

​রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী ভাবমূর্তি: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত বিরোধের এই নজির সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীদের হাতে নতুন সমালোচনার অস্ত্র তুলে দেবে, যা সামগ্রিক মাদকবিরোধী দূরদর্শী অভিযানের নৈতিক গুরুত্বকে অনেকটাই ধূসর করে দিতে পারে।

​৩. ভুক্তভোগী পরিবারের হাহাকার ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়

​আইনের কোনো জটিল বা শুষ্ক ব্যাখ্যা, কিংবা প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডের কোনো আমলাতান্ত্রিক যুক্তি দিয়ে কি সেই সন্তানহারা মায়ের কান্না থামানো সম্ভব, যাঁর স্বপ্ন চোখের সামনে মাদকের নীল ছোবলে ছাই হয়ে গেছে? যে হাজারো পরিবার নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিয়ে মাদকাসক্ত সন্তানের চিকিৎসার পেছনে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, তারা কোনো প্রটোকলের খাতা দেখে সন্তুষ্ট হতে পারে না; তারা চায় কেবল অপরাধ ও অপরাধীর দ্রুত নির্মূল।

​রাষ্ট্র কেবল কোনো যান্ত্রিক আইনি বিধিমালা বা প্রশাসনিক কাঠামো নয়; নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার শেষ সুদৃঢ় আশ্রয়স্থল।প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে যখন বছরের পর বছর ধরে মাদক সিন্ডিকেটগুলোকে পুরোপুরি উৎখাত করা সম্ভব হয় না, তখন জনগণ বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল্প বা যেকোনো তীব্র পদক্ষেপকেই মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন দেয়। নাগরিকের এই গভীর হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির চূড়ান্ত দায় থেকে রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক ব্যবস্থা কোনোভাবেই নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না।

​পরিশেষে: রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
​প্রশাসনিক নিয়ম, চেইন অব কমান্ড এবং শৃঙ্খলা নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও পেশাদার রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য শর্ত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেই নিয়ম বা শৃঙ্খলা যেন কোনো অবস্থাতেই অপরাধী ও মাদক সম্রাটের জন্য পরোক্ষ সুরক্ষাকবচ বা আইনের ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়। অপরাধীদের মনে আইনের স্পষ্ট ভয় জাগানো এবং সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স নীতির প্রকৃত মূল লক্ষ্য।

​ইশরাক হোসেনের বিদায়ের পর এখন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ নিজেদের দৃঢ় অবস্থান বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা। গেন্ডারিয়া, জেনেভা ক্যাম্পসহ সারাদেশের প্রতিটি চিহ্নিত মাদক আস্তানায় যদি অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে চিরুনি অভিযান চালিয়ে মাদক চক্রগুলোকে স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া না হয়, তবে জনমনে এই বিষাদময় বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে যে—আইন অপরাধ দমনের চেয়ে প্রশাসনিক ক্যাডার বা প্রটোকল রক্ষায় অপরাধ দমনের চেয়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বেশি তৎপর…।
আর সেটি হলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের অবশিষ্ট আস্থাটুকুও চিরতরে বিনষ্ট হবে, যা একটি উদীয়মান জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।