নিজস্ব প্রতিবেদক:মোশাররফ শেখ
বর্ষার থৈ থৈ পানি আর হাওরের বুক চিরে বয়ে চলা ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছে কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক বালিখলা মাছের ঘাট। মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর হাওরাঞ্চলের তাজা ও সুস্বাদু দেশি মাছে মুখর থাকে এই পাইকারি বাজার। প্রতিদিন ভোর থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় এক জমজমাট অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে পরিণত হয় এই ঘাটটি।
যেসব এলাকা থেকে মাছ আসে:
বালিখলা ঘাটে আসা মাছের মূল উৎস কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল। এর মধ্যে প্রধানত মিঠামইন হাওর, ইটনা হাওর, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর বিভিন্ন প্লাবনভূমি, বিল এবং হাওর সংযোগকারী ধনু ও নরসুন্দা নদীর তীব্র স্রোত থেকে স্থানীয় জেলেরা এসব মাছ শিকার করে নিয়ে আসেন। প্রতিদিন শত শত ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও ছোট নৌকা করে হাওরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই ঘাটে মাছ সরবরাহ করা হয়।
মিঠাপানির যেসব মাছ পাওয়া যায়:
বালিখলার বাজারে মিঠাপানির প্রায় সব ধরনের সুস্বাদু দেশি মাছের সমাহার দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
বড় মাছ: আইর, বোয়াল, চিতাল, রুই, কাতলা, মৃগেল ও ঘনিয়া।
ছোট ও মাঝারি মাছ: টেংরা, পাবদা, গুলশা, শিং, মাগুর, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চাপিলা, টাকি এবং বিভিন্ন প্রজাতির খলসা মাছ।
বাজারের সময়সূচি:
বালিখলা মাছের বাজার মূলত সকালের বাজার। প্রতিদিন ভোররাত ৪টা থেকে ৫টার দিকে হাওর থেকে ট্রলার আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার শুরু হয়ে যায়। প্রধান পাইকারি বেচাকেনা ও আড়তদারি চলে সকাল ৫টা থেকে সকাল ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত। তবে এর পরেও স্থানীয় খুচরা ক্রেতাদের জন্য দুপুরের আগ পর্যন্ত মাছ কেনাবেচা চলতে থাকে।
দৈনিক আর্থিক লেনদেন:
মৌসুমের এই সময়ে (বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে) বালিখলা ঘাটে প্রতিদিন ব্যাপক আর্থিক লেনদেন হয়। স্থানীয় আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এই বাজারে প্রতিদিন গড়ে কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়ে থাকে। এখানকার বিশাল লেনদেন কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ভূমিকা রাখছে।
মাছগুলো যেসব জায়গায় যায়:
বালিখলা ঘাটে শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটেই না, বরং এখান থেকে পাইকাররা মাছ কিনে দেশের বিভিন্ন বড় বড় জেলায় সরবরাহ করেন। এই ঘাটের মাছ প্রধানত যায়:
রাজধানী ঢাকা (কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন আড়তে)
বাণিজ্যিক কেন্দ্র ভৈরব
বিভাগীয় শহর সিলেট
এছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলা সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার স্থানীয় বাজারেও এই মাছ নিয়মিত পাঠানো হয়।
হাওরের জীবিকা নির্বাহ ও মৎস্য বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই বালিখলা ঘাট। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (আইস প্ল্যান্ট) এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন হলে এটি দেশের অন্যতম সেরা মৎস্য হাটে পরিণত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।