নিজস্ব প্রতিবেদক :
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা বিজয়া দশমীর নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে মহাসমারোহে শেষ হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষণে অশ্রুসজল চোখে ভক্তরা বিদায় জানান মা দুর্গাকে, একই সঙ্গে প্রার্থনা জানান আগামী বছরের আনন্দময় প্রত্যাবর্তনের। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ দিকনির্দেশনা এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের প্রত্যক্ষ তদারকি ও সমন্বিত পরিকল্পনায় দেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ পরিবেশে পূজা পালিত হয়েছে। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে দেশজুড়ে ভক্তদের মনে একদিকে যেমন ছিল বিষাদের ছায়া, অন্যদিকে ছিল আগামী বছর আবারও দেবীর ধরণীতে আগমনের ব্যাকুল প্রত্যাশা। উৎসবের প্রারম্ভিক সময় থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্ব পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুদৃঢ় উপস্থিতি ও তিন স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের কারণে দুই,একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ পরিবেশে অত্যন্ত শান্তিময় ও উৎসবমুখর পরিবেশে ছয় দিনের এই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। ব্যতিক্রম ছিলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ পুজামন্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি কাজ করার ঘটনা, এটা এবারের পূজার ব্যতিক্রমী ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নিজেও কয়েকটি জেলা সফর করে পূজামন্ডপ পরিদর্শণ করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর সারা দেশের ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে একটি সর্বাত্মক ও সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিলো।পূজামণ্ডপের গুরুত্ব, দর্শনার্থীদের সম্ভাব্য সমাগম, ভৌগোলিক অবস্থান এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়। বিভাগীয় মহানগরী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এমনকি থানা পর্যায় পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সদস্যকে সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বিশেষত মণ্ডপের চারপাশ, জনসমাগমস্থল, প্রধান প্রধান যাতায়াতের পথ, শোভাযাত্রার গতিপথ এবং প্রতিমা বিসর্জনের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে ছিল পুলিশের বিশেষদৃষ্টি ও কড়া নজরদারি। উৎসবের শুরু থেকেই নিরাপত্তার পুরো বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে তদারকি করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গত ১১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় আইজিপি জানান, পূজা যাতে অত্যন্ত নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হতে পারে, সেজন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি জানিয়ে ছিলেন পূজার প্রস্তুতিমূলক সময়, উৎসবের মূল দিনগুলো এবং বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জন ও পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই তিন ধাপে পুরো নিরাপত্তাবলয় সাজানো হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক সৌহার্দ্য বিনষ্ট করার কোনো অপচেষ্টা যাতে কোনো মহল চালাতে না পারে, সে বিষয়ে সব পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর থাকার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধমে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখার তাগিদ দেন। উৎসবের মাঝামাঝি সময়ে, গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আইজিপি অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন। সে সময় তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার বদৌলতে দেশের ৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপে অত্যন্ত আনন্দঘন ও নিরাপদ পরিবেশে পূজা-অর্চনা সম্পন্ন হচ্ছে। পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের সার্বিক সহযোগিতা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনকে অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর করে তুলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচার ও গুজবের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার ওপর জোর দিয়ে শীর্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, অশুভ শক্তি ও কতিপয় সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর অপচেষ্টা চালাতে পারে। তাই কোনো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস বা জাতিগত পরিচয় যা-ই হোক না কেন, এই প্রিয় মাতৃভূমি আমাদের সবার। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থেকে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দীপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯ অক্টোবর নারায়নগঞ্জের ঐতিহাসিক রামকৃষ্ণ মিশনের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের গিয়েও আইজিপি সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করে ছিলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর রাতদিনের নিরলস পরিশ্রমে সার্বিক উৎসবমুখর পরিবেশ সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মাদক, সন্ত্রাস এবং যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না এবং ‘জিরো টলারেন্স,নীতিতেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিজয়া দশমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি বিসর্জনস্থলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ঢাকায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বিশাল বিজয়া শোভাযাত্রা সদরঘাটের বুড়িগঙ্গা তীরের দিকে যাত্রা করে, যা দেখতে ও অংশ নিতে রাস্তায় সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিসর্জনস্থলে অতিরিক্ত জনসমাগম, যানজট এবং পানিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কথা বিবেচনায় রেখে ডুবুরি দল, নৌপুলিশ এবং উপকূলীয় উদ্ধারকারী বাহিনীগুলোকে পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ ও স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার বিশেষ পরিকল্পনাও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়। নদীবেষ্টিত ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সেখানে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। নদী ও উপকূলীয় এলাকার অন্তত ৬১৫টি মণ্ডপ এবং সংশ্লিষ্ট বিসর্জন ঘাটে কোস্ট গার্ডের প্রায় সাড়ে তিন হাজার সশস্ত্র সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দেশের আন্তর্জাতিক সীমানার আট কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত প্রায় ১ হাজার ৮০০ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাধারণ পুলিশ সদস্যের বাইরেও অতিরিক্ত ২ হাজার ৭২ জন সদস্য মোতায়েন ছিল। প্রায় ২২০০০ বডি ওর্ণ ক্যামেরার মাধ্যমে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে সকল পূজা মন্ডপ সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হয়। এর পাশাপাশি দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্বের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছিল। ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা প্রতিরোধে বিশেষ গোয়েন্দা সাইবার টিম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে। কোনো যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে সমাজে যাতে বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক তৈরি হতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সাধারণ মানুষকে যেকোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড বা উসকানিমূলক বার্তার কথা সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছিল। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন ও নাগরিক সচেতনতার ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার সহজেই নস্যাৎ করা সম্ভব হয়।
শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি একটি অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন এবং জাতীয় উৎসব হিসেবে ফুটে ওঠে। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও পেশার মানুষের মণ্ডপে আগমন, একে অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কাজের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িকতার যে উজ্জ্বল নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়েছে, তা আমাদের জাতীয় সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করেছে। উৎসবের সফল ও শান্তিময় সমাপ্তিতে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো.আলী হোসেন ফকির ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপসমূহ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “সম্মিলিত প্রয়াস, সরকারের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা ও জনগণের দায়িত্বশীল আচরণের কারণে সারাদেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মণ্ডপে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসামান্য উদাহরণ। আমি আমাদের দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পূজা উদ্যাপন কমিটি এবং সর্বোপরি সর্বস্তরের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করছি, যাঁদের সক্রিয় সহযোগিতা ও আন্তরিক মনোভাব আমাদের দায়িত্ব পালনকে সহজ ও সাফল্যমণ্ডিত করেছে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে এ দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন স্বাধীন, স্বচ্ছন্দ ও পূর্ণ নিরাপত্তায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন, সেই অঙ্গীকার রক্ষায় পুলিশ বাহিনী সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরো বলেন পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সফল বাস্তবায়ন, পূজা কমিটির সার্বিক সহযোগিতা এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতার ফলে দেশজুড়ে এই শারদীয় দুর্গোৎসব একটি ঐতিহাসিক সাফল্য এবং অনাবিল শান্তির স্মারক হয়ে সমাপ্ত হলো।