নুরুল কায়সার জুয়েল
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত জনপদ টেকনাফ। একদিকে নাফ নদী, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ও পাহাড়—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদটি একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। সেন্টমার্টিনের প্রবেশদ্বার হওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা যেমন রয়েছে, তেমনি টেকনাফ স্থলবন্দর থেকেও সরকার বিপুল রাজস্ব পেয়ে থাকে।
২০০০ সালে টেকনাফ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা ছিল—ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ২৬ বছর পরও সেই প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন পৌরবাসী।
স্থানীয় অনেকে অভিযোগ করে জানান, পৌরসভা হয়েছে, ভবন হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পও হয়েছে—কিন্তু নাগরিক সেবার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন হয়নি। শহরের বিভিন্ন সমস্যা বছরের পর বছর ধরে রয়ে গেছে। ফলে টেকনাফ পৌরসভা এখনো আধুনিক শহরের চেয়ে বড় একটি অপরিকল্পিত বাজারের চেহারাই বেশি বহন করছে বলে অভিযোগ তাদের।
ভবন আছে, গণশৌচাগারে তালা!
টেকনাফ প্রেস ক্লাবের পাশে ও মডেল থানার সামনে নির্মিত নতুন পৌর ভবনের নিচে গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের অফিসের পাশেো গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে টেকনাফে আসা পর্যটক ও যাত্রীরা প্রয়োজনের সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত শৌচাগার না পেয়ে বিপাকে পড়েন।
পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জনবল সংকটের কথা বলা হয়ে থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি গণশৌচাগার নির্মাণের আগে সেটি পরিচালনা, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো না কেন?
সড়কবাতি প্রকল্পের পরিণতি কী?
টেকনাফ শহরের বিভিন্ন সড়কে স্থাপন করা হয়েছে সোলার স্ট্রিট লাইট। উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ-নির্ভরতা কমিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আলোকিত রাখা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সোলার লাইট এখন অচল। কোথাও প্যানেল থাকলেও আলো নেই, কোথাও ব্যাটারি বা অন্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।
ফলে জননিরাপত্তা ও রাতের চলাচল সহজ করার উদ্দেশ্যে স্থাপন করা এসব বাতির অনেকগুলো এখন সড়কের পাশে শুধু খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনগণের অর্থে স্থাপিত এসব লাইটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত যাচাই করা হয় কি না—এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
পরিকল্পিত কাঁচাবাজার নেই, ফুটপাতেই ব্যবসা
টেকনাফের অর্থনীতিতে পান, সুপারি, মাছ, শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুল অর্থের লেনদেন হলেও একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক কাঁচাবাজার না থাকায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতকে বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ।
ফলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তৈরি হচ্ছে যানজট। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদেরও বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
অন্যদিকে মাছ, সবজি ও অন্যান্য পণ্যের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না হলে দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।
পৌরবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত একটি পরিকল্পিত কাঁচাবাজার নির্মাণ এবং ফুটপাতকে পথচারীবান্ধব করার উদ্যোগ নিতে হবে।
মশার উপদ্রব, ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ
বর্ষা ও বৃষ্টির পর মশার উপদ্রব বাড়লেও পৌর এলাকায় নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
তাদের অভিযোগ, পৌরসভার ফগার মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম থাকলেও নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কম । বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি, নালা-নর্দমা ও ময়লা-আবর্জনার কারণে মশার প্রজননস্থল তৈরি হলেও সেগুলো পরিষ্কার ও নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগ কম দেখা যায় বলে অভিযোগ।
স্থানীয়রা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে কার্যকর ও নিয়মিত মশক নিধন কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
প্রশাসকের দায়িত্বে ইউএনও, বাড়ছে তদারকির প্রশ্ন
বর্তমানে টেকনাফ পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। উপজেলা প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পাশাপাশি পৌরসভার প্রশাসনিক ও নাগরিক কার্যক্রম তদারকি করতে গিয়ে বাস্তবিকভাবে কতটা সময় দেওয়া সম্ভব—এ প্রশ্নও তুলছেন পৌরবাসী।
একই সঙ্গে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না।
তাদের দাবি, পৌরসভার প্রতিটি শাখার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২৬ বছরের হিসাব চায় পৌরবাসী
একটি পৌরসভা শুধু কর আদায়, ইজারা দেওয়া কিংবা ভবন নির্মাণের প্রতিষ্ঠান নয়। নাগরিকদের জন্য নিরাপদ সড়ক, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত বাজার, গণশৌচাগার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও পৌর কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব।
তাই ২৬ বছর পর টেকনাফবাসীর প্রশ্ন—এত বছরে পৌরসভার উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র কী? কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে? কোন প্রকল্প এখন সচল, আর কোনগুলো অচল? নাগরিকরা কতটা সেবা পেয়েছেন?
এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ টেকনাফ পৌরসভার নাগরিক সেবা, চলমান ও সম্পন্ন প্রকল্প, সোলার লাইট, বাজার ব্যবস্থাপনা, গণশৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
২৬ বছর ধরে অপেক্ষার পর টেকনাফবাসীর দাবি এখন আর নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—তারা চান দৃশ্যমান পরিবর্তন, কার্যকর নাগরিক সেবা এবং পৌর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।