স্টাফ রিপোর্টার :
মেঘনার স্রোতের মতোই যেন গতি বাড়ছে ভৈরবের পৌর নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতায়। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার আগেই পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, স্টিকার ও ফেস্টুন দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নানা ধরনের প্রচার ও জনসংযোগ।
চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এখন ঘুরেফিরে আসছে একটি প্রশ্ন—আগামী দিনে ভৈরব পৌরসভার নেতৃত্বে কে আসছেন?
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা
আসন্ন ভৈরব পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কয়েকজন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—ভৈরব পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র হাজী মোহাম্মদ শাহিন, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি মজিবুর রহমান,সাংবাদিক ও অভিনেতা মোঃ শামীম আহমেদ,গণঅধিকার পরিষদের নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল,আলহাজ্ব কাজী মাও. এম. এ. রউফ ।
এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণার প্রাথমিক পর্যায়ে ভৈরব রিকশা মালিক সমিতির চেয়ারম্যান ও শ্রমিক নেতা ফয়েজ উল্লাহ এবং ভৈরব উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক (প্রত্যাহারপ্রাপ্ত) নিয়াজ মোর্শেদ আঙ্গুরকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়ে পোস্টার দেখা গেলেও বর্তমানে তাঁদের পক্ষ থেকে নতুন করে উল্লেখযোগ্য প্রচারণা চোখে পড়ছে না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা তফসিল ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
ভৈরব পৌরসভার নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে তৎপরতা। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের সামাজিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান, নাগরিক সমস্যা নিয়ে বক্তব্য এবং বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম তুলে ধরছেন।
ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা, দলীয় সংগঠক, ধর্মীয় ও শিক্ষাঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিত্ব, নাগরিক ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় ব্যক্তি এবং গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মুখ।
সাবেক মেয়র হাজী মোহাম্মদ শাহিনের রয়েছে পৌর প্রশাসনের পূর্ব অভিজ্ঞতা। ভৈরব পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি মজিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। বিএনপির পৌর কমিটির সভাপতি হিসেবে হাজী শাহিন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মজিবুর রহমানের নাম আগে থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।
সাংবাদিক ও অভিনেতা মোঃ শামীম আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, অনিয়ম-অসঙ্গতি, জনদুর্ভোগ ও সামাজিক বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তাঁর পক্ষ থেকেও পোস্টার, ব্যানার, স্টিকার ও ফেস্টুনের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া হচ্ছে।
‘অবাধ, সুষ্ঠু ও বৈষম্যহীন নির্বাচন’ চেয়ে শামীম আহমেদের বক্তব্য
শনিবার (৩ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে সাংবাদিক ও অভিনেতা মোঃ শামীম আহমেদ একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শামীম আহমেদ বলেন, তাঁর আবেদন কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রার্থীর পক্ষে নয়; বরং ভৈরবের ভোটারদের অধিকার, মর্যাদা ও ভোটের স্বাধীনতার পক্ষে। তিনি এমন একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করেন, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, বিরোধী মতের প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাধারণ ভোটার সবাই সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা পাবেন।
গণঅধিকার পরিষদের ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। অন্যদিকে শ্রমিক নেতা ফয়েজ উল্লাহর নামও প্রাথমিক পর্যায়ের পোস্টার প্রচারণায় আলোচনায় আসে।
অনলাইনেও বাড়ছে রাজনৈতিক তৎপরতা
বর্তমানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণার বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক। ফেসবুকে পোস্ট, ভিডিও বার্তা, লাইভ, শুভেচ্ছা পোস্ট এবং বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল, মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের বর্তমান তালিকাকে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালে পৌরসভা নির্বাচন আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করেছে। ফলে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রচার-প্রচারণা ও অন্যান্য কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হবে।
নাগরিক প্রত্যাশার কেন্দ্রে উন্নয়ন ও সেবা
ভৈরব পৌরসভা দীর্ঘদিন ধরেই বন্দরনগরী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্নতা, সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভৈরব পৌরসভা ৭৭ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার ৫১৭ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে।
পৌর নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সামনে তাই রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা নিরসন, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পৌর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
সব মিলিয়ে তফসিল ঘোষণার আগেই ভৈরব পৌরসভাকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। পোস্টার-ব্যানার, জনসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত কারা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন, কোন দল কাকে সমর্থন দেবে এবং ভোটাররা কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।
ভৈরব পৌরবাসীর প্রত্যাশা—প্রতিযোগিতা হোক শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণ হোক ব্যাপক এবং নির্বাচনী পরিবেশে প্রতিটি ভোটার যেন স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পান।