September 24, 2026, 11:48 pm
শিরোনাম:
ভৈরবে আমান টাওয়ারের ১২ দফা দাবি থেকে আমলাপাড়ার ৮তলা ভবন—নকশা, ফাউন্ডেশন ও নির্মাণবিধি যাচাইয়ের দাবি নরসিংদী বেলাবোতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ রাজারহাটে বসতভিটা ভরাট বন্ধ, অনিশ্চয়তায় তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব ৫ পরিবার সংশোধনী ​নারায়ণগঞ্জে ৫ হাজার কেজি চোরাই পলিদানাসহ আটক ২, কাভার্ডভ্যান জব্দ। কবির আহমেদ পপুলার লাইফের ভাইস চেয়ারম্যান পুননির্বাচিত চট্টগ্রামে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ সাবরেজিস্ট্রার ও দুই সহযোগী আটক সন্ত্রাস দমনে সাহসিকতার স্বীকৃতি, পিপিএম পদকের জন্য ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া রাজারহাটে তিস্তার বালু দিয়ে জমি ভরাটের অভিযোগে ড্রেজার জব্দ-ধ্বংস রাজারহাটে একই কর্মকর্তা জেলা উপপরিচালক, প্রোগ্রাম অফিসার ও তিন উপজেলার দায়িত্বে

ভৈরবে আমান টাওয়ারের ১২ দফা দাবি থেকে আমলাপাড়ার ৮তলা ভবন—নকশা, ফাউন্ডেশন ও নির্মাণবিধি যাচাইয়ের দাবি

Reporter Name

 

প্রতিবেদন: শামীম আহমেদ
ভৈরব, কিশোরগঞ্জ।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণকে ঘিরে অনুমোদিত নকশা, ভবনের উচ্চতা, ফাউন্ডেশন, সেটব্যাক, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও নির্মাণ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজ চলাকালে সড়ক ও জনচলাচলের জায়গা ব্যবহারের বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কমলপুর এলাকার নির্মাণাধীন ‘আমান টাওয়ার’ নিয়ে ১২ দফা দাবিতে আবেদন এবং আমলাপাড়া এলাকায় বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যালয়ের সামনে কালিকাপ্রসাদের প্রবাসফেরত জাহাঙ্গীর আলমের নির্মাণাধীন ৮তলা ভবনকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।

তবে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন পৌরসভার নথি যাচাই, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের তুলনা এবং প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত পরীক্ষা। অভিযোগ উঠেছে বলেই কোনো ব্যক্তি বা ভবন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা নয়—বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

১৭ দিন পর আমান টাওয়ার নিয়ে পৌর প্রকৌশলীর বক্তব্য
গত ৭ সেপ্টেম্বর কমলপুর এলাকার আমান টাওয়ার নিয়ে ১২ দফা দাবি সংবলিত আবেদন করা হয় বলে আবেদনকারী পক্ষ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ওই আবেদনের অগ্রগতি জানতে চাইলে ভৈরব পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ সারোয়ার বাতেন বলেন, আমান টাওয়ারের নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগে সম্পন্ন হয়েছে। ওই সময়ে তিনি ভৈরব পৌরসভায় কর্মরত ছিলেন না। পরে যোগদানের পর সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং ভবন কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

তিনি আরও বলেন, ভবনটি নির্মাণের সময় কেন বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলেননি, সেটিও একটি প্রশ্ন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ভৈরব পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

আমলাপাড়ায় ৮তলা ভবন নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এদিকে ভৈরব পৌর শহরের কমলপুর-আমলাপাড়া এলাকায় বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যালয়ের সামনে কালিকাপ্রসাদের প্রবাসফেরত জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির ৭তলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে এবং ৮তলার জন্য রড ও ফিলার স্থাপনের কাজ চলছে। বিষয়টি দুই দিন আগে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়। বৃহস্পতিবার পুনরায় জানতে চাইলে তিনি জানান, পৌরসভা থেকে লোক পাঠানো হয়েছিল; তবে সেখানে সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। ভবনটির তদারকির দায়িত্বে ‘সেলিম’ নামে একজন রয়েছেন বলেও জানা গেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বিষয়টি যাচাই করে ভবন মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভৈরব পৌরসভা এলাকায় নতুন ভবনের ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৭তলা পর্যন্ত অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়; ৮তলা নির্মাণের অনুমোদনের প্রশ্নই ওঠে না। নির্মাণবিধি অমান্যের অভিযোগ পাওয়া কয়েকটি ক্ষেত্রেও ইতিপূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

নির্মাণসামগ্রী রেখে সড়কের অংশ ব্যবহারের অভিযোগ
শুধু ভবনের উচ্চতা বা অনুমোদনের প্রশ্নই নয়, আমলাপাড়া এলাকায় নির্মাণকাজ চলাকালে প্রধান সড়কের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণসামগ্রী রাখার কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ভবনটির জন্য সড়কের একটি অংশে ইট, বালি, কংক্রিট এবং ডালায় মেশিন রাখা হয়েছে। এতে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষ করে আমলাপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এবং ভৈরব বাজারে যাতায়াতকারী মানুষজনকে ওই পথ ব্যবহার করতে হয়। ফলে সড়কের জায়গা নির্মাণসামগ্রী রাখার কাজে ব্যবহারের কারণে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, নির্মাণকাজ চললেও জনসাধারণের চলাচলের সড়ক যেন দীর্ঘ সময় দখল বা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে না থাকে, সে বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’—এর পর কী?
এখানেই সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পর পৌর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

কোনো বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে শুধু ভবনটি কততলা হয়েছে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। অনুমোদিত নকশা, জমির ব্যবহার, সেটব্যাক, মাটির প্রকৃতি ও পরীক্ষা, কাঠামোগত নকশা, ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা, নির্মাণসামগ্রীর মান, অগ্নিনিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য কারিগরি শর্তও যাচাই করা প্রয়োজন।

এ কারণে স্থানীয়দের দাবি, আমান টাওয়ার ও আমলাপাড়ার নির্মাণাধীন ভবন—দুটির ক্ষেত্রেই অনুমোদিত নকশা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি বাস্তব নির্মাণের সঙ্গে নকশার মিল রয়েছে কি না, তা প্রকৌশলগতভাবে পরীক্ষা করা হোক।

প্রশাসকের বক্তব্য
ভৈরব পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, কমলপুর এলাকার আমান টাওয়ার নিয়ে স্থানীয় একজন ১২ দফা দাবি জানিয়ে আবেদন করেছেন। আবেদন পাওয়ার পর ভবন মালিক পক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সন্তোষজনক কারণ দেখাতে না পারলে পৌরসভার প্রযোজ্য নির্মাণবিধি অমান্যের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন সবার জন্য সমান বলেও জানান তিনি।

আমলাপাড়া বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যালয়ের সামনে জাহাঙ্গীর আলমের নির্মাণাধীন ভবনটির বিষয়েও তাঁকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, ওই ভবন মালিককেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নোটিশের পর কার্যকর তদন্তের অপেক্ষা
আমান টাওয়ার ও আমলাপাড়ার নির্মাণাধীন ভবনকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অনুমোদিত নকশা বনাম বাস্তব নির্মাণের সরেজমিন যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে প্রকৌশলগত পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে শুধু ফাউন্ডেশন কত গভীর বা ভবন কততলা—এ ধরনের একটি তথ্য দিয়ে কোনো ভবনের নিরাপত্তা নির্ধারণ করা যায় না। মাটির ধরন, ভবনের ওপর সম্ভাব্য লোড, কাঠামোগত নকশা, ফাউন্ডেশনের নকশা ও প্রকৌশলগত হিসাবসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।

একটি বহুতল ভবন শুধু ইট, বালি, রড ও সিমেন্টের সমষ্টি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা। তাই নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে যেমন তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি, তেমনি অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে নথি ও প্রকৌশলগত পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভৈরববাসীর প্রত্যাশা—আমান টাওয়ার ও আমলাপাড়ার জাহাঙ্গীর আলমের নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করবে এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী রেখে জনসাধারণের চলাচলের সড়ক বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

কারণ শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ নয়—নিরপেক্ষ যাচাই, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই বহুতল ভবন নির্মাণে পৌরসভার নজরদারির কার্যকারিতা এবং জনসাধারণের আস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।